
🔷 ১. যুদ্ধের বাস্তবতা ও সামরিক বাজেট বৃদ্ধি
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের ১২ দিনের সরাসরি সংঘর্ষ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংঘাত। এই সংঘর্ষ ইরানকে কৌশলগতভাবে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। তারই প্রতিক্রিয়ায়, ইরান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামরিক বাজেট ২০০ শতাংশ বাড়িয়ে ৪৬ বিলিয়ন ডলার করেছে, যা পূর্ববর্তী ১৫.৭ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় তিনগুণ।
🔷 ২. সাংবিধানিক ও আইনগত পদক্ষেপ
ইরানের সংসদ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাসহ একটি বিল পাস করেছে, যার লক্ষ্য সামরিক তহবিল নিশ্চিত করা:
- পূর্ণ বাজেট পরিশোধ: আগের বছরের অনাদায়ী অর্থসহ সম্পূর্ণ বাজেট পরিশোধের বাধ্যবাধকতা।
- নিরবচ্ছিন্ন বরাদ্দ: সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল অনুমোদিত বাজেট শতভাগ বাস্তবায়ন।
- বিদেশি সম্পদ ছাড়: জরুরি প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবরুদ্ধ বিদেশি তহবিল ব্যবহার করবে।
এই আইন প্রতিরক্ষা খাতে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও তহবিলের কেন্দ্রীকরণকে আরও জোরালো করেছে।
🔷 ৩. মনোবলের উপরে জোর
সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আশতিয়ানি সরাসরি বলেছেন, যুদ্ধের জয়ের ৭৫% নির্ভর করে মনোবলের উপর, অস্ত্রের উপর নয়। তিনি দাবি করেন, ইরান শুধুমাত্র উন্নত অস্ত্রে নয়, অপারেশনাল অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণে প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে। এই মনোভাব ইরানের সামরিক দর্শনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
🔷 ৪. স্বনির্ভরতা ও সামরিক শিল্প
ইরান দাবি করছে, দেশটির সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৯০-৯৩ শতাংশ স্বনির্ভর। ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশন (DIO)’ ও ‘ইরান ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রিজ (IEI)’ মিলে ৩ হাজারের বেশি কোম্পানি ও ৯২টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে দেশীয় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধান অস্ত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য:
- ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র: ফাত-৩৬০
- ড্রোন: মোহাজের-৬, মোহাজের-১০, কামান-২২
- ট্যাংক ও যান: জুলফিকার, রাখশ এপিসি
🔷 ৫. যুদ্ধের বাস্তব প্রভাব ও প্রেসিডেন্ট আহত
জুনের সংঘর্ষে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি হামলায় আঘাতপ্রাপ্ত হন। এই বাস্তব আক্রমণ প্রমাণ করে, যুদ্ধ ইরানের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে গেছে, এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়।
🔷 ৬. আইআরজিসি’র (IRGC) প্রাধান্য
২০২৫ সালের বাজেটে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কে অন্যান্য বাহিনীর তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ভবিষ্যতের সামরিক তৎপরতায় IRGC মূল চালিকাশক্তি হবে। তাদের শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক প্রভাব আগামি দিনের সংঘাতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে।
🔷 ৭. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি
এই বাজেট শুধু সামরিক খরচ নয়—একটি দশ বছরের যুদ্ধ পরিকল্পনার রূপরেখা। সরকার এবং সামরিক নেতৃত্ব বুঝে গেছে, আধুনিক সংঘর্ষে শুধু অস্ত্র নয়, অর্থনৈতিক সহনশীলতা, মনোবল এবং উৎপাদন ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রস্তুতি একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘কঠোর প্রতিরোধ কৌশল’ (hard resistance doctrine)-এর প্রতিফলন। যেখানে কূটনৈতিক পিছু হটার পরিবর্তে আঞ্চলিক আধিপত্য এবং প্রতিরোধকে মূল কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
🔷 উপসংহার:
ইরান এখন আর শুধুই প্রতিরক্ষার চিন্তা করছে না—তারা একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও মনোবলনির্ভর যুদ্ধ কৌশলের ভিত তৈরি করছে। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, আইনগত প্রস্তুতি, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার সংমিশ্রণে ইরান নিজেকে পরবর্তী দশকের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত করছে।